না ফেরার দেশে চলে গেলেন কিংবদন্তী উদ্যোক্তা বীর মুক্তিযোদ্ধা,জয়নুল হক সিকদার

মিথিলা আক্তারঃ কঠিন রাশভারী মানুষ। ৯১ বছর বয়সেও মাসের ৩০ দিন অফিস করেন তিনি। দুপুরের খাবারের পরও কখনো বিশ্রাম নেন নি। দেশ–বিদেশের সব ব্যবসা সামাল দিতেন নিজেই। কাজপ্রিয় এই মানুষটির নাম জয়নুল হক সিকদার। সবাই তাকে সিকদার সাহেব হিসেবেই জানেন। এরই মধ্যে তিনি ব্যাংক–শিল্প–রিয়েল এস্টেটসহ বিভিন্ন ব্যবসার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করেছেন একাধিক মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতাল।

জয়নুল হকের জন্ম ১৫ মে, ১৯৩৩ সালে, এবং মৃত্যু কালে তার বয়স হয়েছিল ৯১ বসর।তিনি ভারতের আসামে জন্ম গ্রহণ করেন। বাবা মখফর উদ্দিন সিকদার ছিলেন প্রথমে ফরেস্টার, পরে নামজাদা ঠিকাদার। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার। স্কুলে পড়ার সময় বাবার কাছ থেকে ২-১ টাকা থেকে শুরু করে ৫০-১০০ টাকা পর্যন্ত নিতেন। যদিও তখন টাকার মূল্য ছিল বেশ। সে সময় ১ টাকায় এক মণ চাল পাওয়া যেত। এভাবেই জয়নুল হক সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় একবার বাবার কাছ থেকে ১০০ টাকা নিয়ে চুপটি করে কাঠের ব্যবসা শুরু করলেন। কাঠ কিনে এনে নদীর পাড়ে রাখতেন। তারপর ফের সেগুলো খুচরা ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে দিতেন। তখন আসামে প্রায়ই মেলা হতো। আর মেলা হলেই চার-পাঁচটি দোকানের সঙ্গে চুক্তি করতেন কিশোর জয়নুল। তিনি বলেন, ‘ব্যবসাটা আমার নেশার মতো লাগত। মেলা এলে চার-পাঁচটি দোকানে লটারির টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা করতাম। জিনিস কিনে দিতাম সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার। ওই টিকিট বেঁচে বেশ ভালো ইনকাম হতো। যদিও আমার বাবা শুনে খুব রাগারাগি করতেন। সে জন্য এক প্রকার চুরি করেই কাজটি করতাম।’

তার গ্রামের নাম মধুপুর।শরিয়তপুর জেলার এ গ্রামটিতে রয়েছে ‘মনোয়ারা সিকদার মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল’। সিকদার সাহেব নিজ গ্রামে নেমেই প্রথমে বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করতেন। সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে রওনা হয়ে পাশের গ্রামে। স্ত্রীকে নিয়ে এবার রামভদ্রপুরে স্ত্রীর বাবা-মা অর্থাৎ তার শ্বশুর-শাশুড়ির কবর জিয়ারত করতেন। ‘একসময় এই গ্রামে কোনো পাকা পথঘাট ছিল না। রিকশা-ভ্যান চলত না। যানবাহন বলতে ছিল কেবল লঞ্চ-স্টিমার। বর্ষার দিনে মানুষ জুতা-স্যান্ডেল হাতে নিয়ে চলত। নদী সাঁতরে স্কুলে যেত’— বলতেন সিকদার সাহেব।

আজ সেখানে স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। নিজ খরচে পাকা রাস্তাঘাট বানিয়েছেন সিকদার সাহেব। ১৩-১৪টি স্কুল ও অর্ধশতাধিক মসজিদ তৈরিতে অবদান রেখেছেন তিনি। এমনকি তৈরি হচ্ছে হেলিকপ্টার ট্রেনিং স্কুল এবং বিমানবন্দর। বাংলাদেশে, তা-ও আবার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে ব্যক্তি-উদ্যোগে বিমানবন্দর হবে— ভাবতেই কেমন যেন স্বপ্নের মতো মনে হলো। জানিনা তার উত্তরসূরিরা তার এই স্বপ্ন পূরণ করবে কিনা। এ দুর্লভ স্বপ্নের নায়ক বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশে হেলিকপ্টার প্রশিক্ষণের সুযোগ খুব কম। কাউকে এ ধরনের প্রশিক্ষণ নিতে হলে বিদেশে যেতে হয়। আর সে কারণেই এখানে একটি হেলিকপ্টার ট্রেনিং স্কুল করছি। তাদের ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটির জন্য বিমানবন্দর করছি। তা ছাড়া বিমানবন্দরটি চালু করতে পারলে এ অঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছি। ’ প্রস্তাবিত বিমানবন্দরের ৩ হাজার ৩০০ ফুট লম্বা রানওয়ে আর দুই পাশে লেক, জেড এইচ সিকদার ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়বে বঙ্গবন্ধুর একটি দৃষ্টিনন্দন ম্যুরাল। সিকদার গ্রুপের প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই এভাবে বঙ্গবন্ধুকে পাওয়া যায়। এ নিয়ে জানতে চাইলে হঠাৎই যেন একাত্তরে ফিরে গেলেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। বললেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের কাহিনী ও মুক্তিযুদ্ধের গল্প। ‘১৯৪৬ সালে ট্রেনে করে কলকাতা যাচ্ছিলাম। ওই ট্রেনে বঙ্গবন্ধুও যাচ্ছিলেন। তখন তাকে চিনি না। একজন সাদা পোশাকে এসে আমাকে সার্চ করল। আমি বললাম, আপনি পুলিশ না, কিছু না, কিন্তু এমন করছেন কেন। সে বলল, এটা আমার নৈতিক দায়িত্ব। পরে একজনের কাছে জিজ্ঞাসা করলাম, কার জন্য এমন ব্যবস্থা? তিনি কে? উত্তরে লোকটি বলল, তিনি শেখ মুজিব। সেই প্রথম মুজিব ভাইকে দেখলাম। এরপর ১৯৫০ সালে একটি কাজে আতাউর রহমানের কাছে গিয়েছিলাম। সেখানে ভাসানী সাহেবও ছিলেন। আর তাদের সঙ্গে বসে আলাপ করছিলেন শেখ সাহেব। আমাকে দেখে হাসলেন। পরিচিত হলেন। বললেন, আমরা আওয়ামী লীগ গঠন করছি। আমি বললাম, এটি আবার কোন লীগ? এর পর থেকে আস্তে আস্তে মুজিব ভাইয়ের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হলো। ’

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বীরের মতো লড়াই করেছেন জয়নুল হক। প্রায় ৩ হাজার মুক্তিযোদ্ধার একটি দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। গড়ে তুলেছিলেন আক্কাস বাহিনী। এ বাহিনীর রহস্য নিয়ে বললেন, ‘আক্কাস নামে এখানে একটি ছেলে ছিল যে যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা গিয়েছিল। তার নামেই এ বাহিনীর নামকরণ করেছিলাম। আমাদের আন্ডারে চারটি থানা ছিল। পরোক্ষ নয়, প্রত্যক্ষভাবেই যুদ্ধ করেছি আমি। আগস্টের দিকেই শরীয়তপুর স্বাধীন করতে পেরেছিলাম। ’

বিশ্ববিদ্যালয়টি তে যে সুযোগ সুবিধা আছে , আছে ব্যবসায় শিক্ষা, ইংরেজি ও আইন বিভাগও। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও দরিদ্র শিক্ষার্থীসহ অন্তত আড়াইশ’ শিক্ষার্থী সম্পূর্ণ বিনা খরচে পড়ালেখা করার সুযোগ পাচ্ছেন। সাগর মণ্ডল নামে ইংরেজি বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলছিলেন, ‘গ্রামে বসে এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারব কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি। ’

পরে নির্মাণাধীন বৃদ্ধাশ্রম দেখতে যাওয়ার পথে বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ, টেনিস গ্রাউন্ড, কমার্শিয়াল চাইনিজ রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন অবকাঠামো চোখে পড়ল। এরপর দেখলাম সিকদার সাহেব সুন্দর এ গ্রামটিতে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলছেন একটি বৃদ্ধাশ্রম। আশ্রমের সামনে শান বাঁধানো ঘাট, আর স্বচ্ছ পানির পুকর, ‘পল্লীকুঠি’র, পারিবারিক এ রিসোর্টটি দেখতে বিকালে ভিড় জমান আশপাশের গ্রামের শত শত মানুষ। গুণী এই মানুষের কথা যতোই বলবো শেষ হবে না,

সিকদার সাহেবএর জীবনে সবচেয়ে ভালোলাগার বিষয় ছিল কাউকে উপকার করতে পারা। (tribune24.news) এর পক্ষথেকে কিং বদন্তি এই বীরের শোক সংক্রান্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন

Back to top button
error: দয়া করে নিঊজ কপি করা থেকে বিরতো থাকুন