সুবিধাভোগী নারীদের সঞ্চয়ের টাকা আত্মসাৎ, অভিযোগ ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে

কুমিল্লা প্রতিনিধি।।

কুমিল্লায় দুস্থ, অসহায় ও সুবিধাভোগী নারীদের সঞ্চয়ের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগ কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার ৯নং উত্তর হাওলা ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক অসহায় ও সুবিধাভোগী নারীর। তারা প্রতি মাসে ভিজিডি কার্ডের মাধ্যমে চাল উত্তোলনের সময় ইউনিয়ন পরিষদে ৩শ টাকা করে সঞ্চয় রাখেন এক সঙ্গে কিছু টাকা পাবেন বলে। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নে রূপ নিলো। তাদের সঞ্চয়ের টাকা সম্পূর্ণভাবে ফেরত দেওয়ার পরিবর্তে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই সঞ্চয়ের টাকা আত্মসাতে সুবিধাভোগীদের অভিযোগ কুমিল্লা মনোহরগঞ্জ উপজেলার ৯নং উত্তর হাওলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান হিরুণ ও সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।  

সরেজমিনে গিয়ে ভুক্তভোগী নারীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ২০১৯-২০ সালে মনোহরগঞ্জ উপজেলার ৯নং উত্তর হাওলা ইউনিয়নে দুস্থ ও অসহায় ১৪৪ জন নারী ভিজিডি কার্ডধারী রয়েছেন। দুই বছরের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ তাদেরকে সুবিধাভোগী নির্বাচিত করেন। প্রতি মাসে ভিজিডির চাল উত্তোলনের সময় এই ১৪৪ জন সুবিধাভোগী ইউনিয়ন পরিষদে ৩শ টাকা করে সঞ্চয় রাখেন। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে তাদের ভিজিডি কার্ডের মেয়াদ দুই বছর পূর্ণ হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে সঞ্চয়ের সম্পূর্ণ টাকা ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও তাহা ফেরত পেতে নানা বিড়ম্বনা শিকার এবং টাকা কম পাওয়ার অভিযোগ করেছেন সুবিধাভোগী এই নারীরা। 

ভিজিডি কার্ডধারী নারীদের অভিযোগ, সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তাদেরকে সঞ্চয়ের টাকা সম্পূর্ণ ফেরত দেয়ার পরিবর্তে আংশিক কিছু টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে। যা কার্ডে প্রতি ৩/৪ হাজার টাকা আত্মসাৎ হয়েছে।  

সুবিধাভোগী উত্তর হাওলা ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের সাইফুল ইসলামের স্ত্রী নাসিমা বেগম জানান, প্রতি মাসে ৩শ টাকা করে গত দুই বছরে (২৪ মাস) সঞ্চয় করেন ৭ হাজার ২ শ’ টাকা। সঞ্চয়কৃত টাকার মধ্যে মাত্র তিন হাজার ৩০০ টাকা ফেরত পেয়েছেন। বাকী তিন হাজার ৯০০ টাকা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ফেরত দেয়নি। আমাদের ভিজিডি কার্ড হাতে দেয়নি এবং কার্ড নম্বরও বলেননি। চেয়ারম্যান বলছেন খেয়ে ফেলেছেন, টাকা নেই গোলমাল হয়ে গেছে। 

সুবিধাভোগী নারীদের মধ্যে একই অভিযোগ, পলাশ মিয়ার স্ত্রী রোকেয়া বেগমের। তিনি ৭ হাজার ২শ টাকার মধ্যে পেয়েছেন ৪ হাজার টাকা ও লনী গোপাল ঘোষের মেয়ে শ্রীমতি রানী পেয়েছেন মাত্র সাড়ে ৩ হাজার টাকা। 

দুস্থ ও অসহায় ইমরান হোসেনের স্ত্রী আমেনা বেগম ফেরত পেয়েছেন ৪ হাজার টাকা। ইমরান হোসেনের অভিযোগ, তার স্ত্রী আমেনা বেগমের নামে ভিজিডি কার্ড। গত দুই বছর যাবত প্রতি ামসে ৩শ টাকা করে তার হাতেই ইউনিয়ন পরিষদে টাকা জমা রেখে স্বাক্ষর দিয়ে আসছিলেন। প্রতিমাসে দুই বছরে ৭ হাজার ২শ টাকা হয়। দুই বছরের মেয়াদপূর্ণ হওয়ার পর সঞ্চয়কৃত টাকার মধ্যে ফেরত দিয়েছেন মাত্র ৪ হাজার টাকা। বাকী ৩ হাজার ২০০টাকা আমাদেরকে ফেরত দেয়নি। 

আমরা অভিযোগ নিয়ে গেলে ইউপি চেয়ারম্যান বলছেন তিনি ৩ হাজার ২০০ টাকা খেয়ে ফেলেছেন। আল্লাহর ওয়াস্তে মাফ করে দিতে। এরপর তিনি আর আমাদের অভিযোগকে গুরুত্ব দেননি।  

ইমরান হোসেনের দাবি করে বলেন, আমরা দুস্থ ও অসহায় মানুষ। স্থানীয় সরকারের মন্ত্রী সহযোগিতা কামনা করেন টাকাগুলো ফিরে পেতে। 

অন্যদিকে ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের ইব্রাহীমের স্ত্রী সালেহা বেগম, আব্দুল করিমের স্ত্রী শাহিদা বেগম, সোহেল মিয়ার স্ত্রী নার্গিস আক্তার এছাড়াও নাম না প্রকাশের শর্তে আরও কয়েকজন দুস্থ নারী সঞ্চয়ের টাকা কম পাওয়ার অভিযোগ করে জানান, প্রায় সকল কার্ডধারী নারীকেই সম্পূর্ণ টাকা ফেরত না দিয়ে তাদের থেকে জোর করে কার্ড নিয়ে নেয়া হয়েছে। টাকা ফেরত পেতে তারা স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মোঃ তাজুল ইসলামের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।

দুস্থ, অসহায় ও সুবিধাভোগী নারীদের অভিযোগ অস্বীকার করে উত্তর হাওলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান হিরুণ জানান, তার বিরুদ্ধে সঞ্চয়ের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সত্য নয়। তিনি জানান, ১৮ মাস সঞ্চয় নেয়া হয়েছে। কোন সুবিধাভোগী নারী ২৪ মাস পুরোপুরি সঞ্চয় দেয়নি। সঞ্চয় নেওয়া টাকা ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জমা রাখা হয়। এটা ব্যাংক ভালো বলতে পারবে। 

ব্যাংক এশিয়ার মনোহরগঞ্জ উপজেলার বাইশগাঁও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের পরিচালক মো. আবু নোমান জানান, ১৮ মাসে ১৭৫ টাকা করে সঞ্চয়ের টাকা জমা নেয়া হয়েছে। আমরা কোন দুস্থ ও সুবিধাভোগীদের সাথে লেনদেন হয়নি। ব্যাংকের সাথে টাকা লেনদেন হয় উত্তর হাওলা ইউনিয়নের সচিবের সাথে। ইউনিয়ন পরিষদ কার্ড অনুসারে যার টাকা জমা দিবেন, ওই ব্যক্তির টাকা ব্যাংকের একাউন্টে যোগ হয়। সেই অনুসারে আমরা পূণরায় সঞ্চয়কৃত টাকা ইউনিয়ন পরিষদকে ফেরত দিয়েছি। ইউনিয়ন পরিষদ কত টাকা করে ফেরত দিচ্ছেন সেটা আমাদের জানার বিষয় নয়। 

এবিষয়ে মনোহরগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সোহেল রানা বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমার কাছে কোন সুবিধাভোগী অভিযোগ করেননি। তারপরও আমি সঞ্চয়ের টাকা আত্মসাতের বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। সত্যতা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত নিবো। 

উল্লাখ্য, কুমিল্লা মনোহরগঞ্জ উপজেলার উত্তর হাওলা ইউনিয়নের এই ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান হিরুণে বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। ডজন খানেক অনিয়ম-দুর্নীতির ফিরিস্তি তুলে ধরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন ওই ইউপির নারী সদস্য লাকী মজুমদার।

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন

Back to top button
error: দয়া করে নিঊজ কপি করা থেকে বিরতো থাকুন